আজ বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস,নিত্যনতুন ভয়ংকর রুটে মানব পাচার

0
107

অনলাইন ডেস্ক::বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গলের একটি পানামা-কলম্বিয়া সীমান্তের ‘ড্যারিয়েন গ্যাপ’। দুর্গমপথে বিষাক্ত সাপ আর হিংস্র বণ্য প্রাণী তো আছেই, সেই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী আর গেরিলাদের অভয়ারণ্য এই জঙ্গলে আছে জিম্মি হওয়ার ভয়। সড়কপথে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার তরুণ যুবক দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া হয়ে পানামায় পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য তারা পাড়ি দেয় ড্যারিয়েন গ্যাপ। এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে জিম্মি, প্রতারণা ও প্রাণহানির শিকার হয় অনেকে। পানামার একটি এনজিওর হিসাবে মানব পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হয়ে যেসব অভিবাসন প্রত্যাশী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ড্যারিয়েন গ্যাপ পাড়ি দেন তার মধ্যে বাংলাদেশিদের অবস্থান তৃতীয়। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর ড্যারিয়েন গ্যাপ পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় অন্তত ১০ হাজার মানুষের। দুর্গম সড়কের পথে পথে পড়ে আছে মানুষের খুলি আর হাড়গোড়। তারপরও এই কঠিন রুট বেছে নেয় প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার অভিবাসী। যাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু ড্যারিয়েন গ্যাপ নয়, মানব পাচারকারীরা লিবিয়া-তুরস্ক থেকে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি; কক্সবাজার টেকনাফ থেকে আন্দামান সাগর, থাইল্যান্ডের সমুদ্র উপকূল পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া; বলকান অঞ্চলের দেশ আলবেনিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোবিনা, মেসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো, গ্রিস, কসোভো, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরি হয়ে ইতালি, ফ্রান্স ও জার্মানিতে পৌঁছায়। কখনো পার্বত্য ঘনবনাঞ্চল, কখনো উত্তাল সমুদ্র, কখনো তপ্ত মরুর বালু পাড়ি দিয়ে তাদের নেওয়া হয় বিভিন্ন গন্তব্যে। আবার ট্যাংক লরি, কাভার্ড ভ্যান কিংবা জাহাজে কনটেইনারের ভিতরে ঢুকিয়ে পাচার করা হয় মানুষ। ভয়ংকর ও নিত্যনতুন বিভিন্ন রুটে পাচার হওয়ার সময় প্রাণ হারায় বহু মানুষ। কেউ কেউ প্রাণে বাঁচলেও জিম্মি করে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয় বাড়তি অর্থ। আবার সাতক্ষীরা, যশোর বেনাপোল, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী সীমান্ত দিয়েও বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয় নারী ও শিশুদের। নিয়ে যাওয়া হয় দুবাই, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে। তাদেরকে বাধ্যতামূলক পতিতাবৃত্তি করানোসহ চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন।
আজ ৩০ জুলাই বিশ্বমানব পাচার প্রতিরোধ দিবস। এবার দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ভিকটিমের কণ্ঠস্বর আমাদের পথ দেখায়।’ বাংলাদেশ থেকে বছর কত মানুষ ভিকটিম হয়ে পাচারের শিকার হয় তার কোনো পরিসংখ্যান কখনোই পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ ও চাঁদপুর জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর রংপুরে মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে ৩৫টি। সিলেটে ৩৯৮ জন নিখোঁজের জিডি হওয়ার পর খোঁজ মিলেছে ৩২৯ জনের। খোঁজ মেলেনি ৬৩ জনের। ময়মনসিংহে ৫৬৬ জন নিখোঁজের জিডি ও মামলা হয়। খোঁজ মিলিছে ৪৩৩ জনের। খোঁজ পাওয়া যায়নি ১৩৩ জনের। চাঁদপুর জেলায় ৪১৩ জন নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সন্ধান পেয়েছে ৩৯৮ জনের। নিখোঁজ আছেন ১৯ জন। দেশের অন্যান্য জেলাতেও বিপুল সংখ্যক মানুষ নিখোঁজ ও নিরুদ্দেশ থাকার তথ্য জানিয়ে থানায় জিডি বা মামলা করা হয়েছে। যার বড় একটি অংশ মানব পাচারের শিকার হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মানব পাচার নিয়ে কাজ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখার (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম উইং। এই উইংয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাচারকারীদের দালাল চক্র। দেশ থেকে বেশি পাচার হয় ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে। এর মধ্যে সর্বাধিক নারী পাচার হয় ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও মালয়েশিয়ায়।

তারা মানব পাচারের যেসব রুট চিহ্নিত করেছেন তার মধ্যে রয়েছে, কলকাতা-দুবাই-মিসর-ত্রিপোলি হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি, বাংলাদেশ থেকে বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া- স্লোভেনিয়া হয়ে ইতালি, আজারবাইজান-তুরস্ক-গ্রিস হয়ে ইতালি, গ্রিস থেকে মেসিডোনিয় কিংবা গ্রিস থেকে আলবেনিয়া ও কসোভো, মন্টিনিগ্রো, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা হয়ে সার্বিয়া। সার্বিয়া থেকে দুই ভাবে ইতালি যায়। প্রথমে স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ সেনজেনের অন্তর্ভুক্ত দেশে প্রবেশ করে। আবার হাঙ্গেরির সঙ্গে সরাসরি সার্বিয়ার সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। অন্যটি হচ্ছে সার্বিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়া হয়ে স্লোভেনিয়া। এ ছাড়া বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা কিংবা মন্টিনিগ্রো থেকে ক্রোয়েশিয়া-স্লোভেনিয়া হয়ে সেনজেনভুক্ত রাষ্ট্রে। অনেক ক্ষেত্রে তুরস্ক থেকে বুলগেরিয়া হয়ে রোমানিয়া অথবা ইউক্রেন হয়ে হাঙ্গেরি কিংবা বুলগেরিয়া থেকে সার্বিয়া হয়ে হাঙ্গেরি অথবা ক্রোয়েশিয়া নেওয়া হয়।

তারা আরও জানান, বলকান দেশগুলোকে ঘিরে ইউরোপে মানব পাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। হেঁটে, ঘন বন-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে কিংবা পাহাড় বেয়ে এমনকি খরস্রোতা নদীতে সাঁতরে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের সীমানা পার হয়ে ইউরোপে ঢোকেন। এসব যাত্রায় অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে এমনকি গাছের পাতা খেয়েও দিন পার করতে হয় অভিবাসন প্রত্যাশীদের। এ ছাড়া উজবেকিস্তানের হয়ে ইউরোপে মানব পাচারের নতুন রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য কক্সবাজার উখিয়ার জালিয়াপালংয়ের বাদামতলী ঘাট, রেজুরমোহনা, ইনানী, চেপটখালী, মনখালী, মাদারবনিয়া, চোয়াংখালীসহ একাধিক ঘাট সংলগ্ন এলাকায় মানব পাচারকারীদের বড় আস্তানা রয়েছে। এসব স্থানে ভাগ্যান্বেষীদের এনে রাতের আঁধারে ডিঙ্গি নৌকায় গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ ট্রলারে তোলা হয়। ট্রলারে সমুদ্রপথে নেওয়া হয় মালয়েশিয়ার উপকূলে। ঢাকা থেকে সরাসরি বিমানে জাকার্তায় নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারা সেখান থেকে মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার মেদান থেকে কয়েক দফায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে আটক করে পুলিশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং অভিবাসন ও উদ্বাস্ত বিশেষজ্ঞ ড. সি আর আবরার বলেন, বেশ কিছু সংঘবদ্ধচক্র মানব পাচার করছে। চাহিদার তুলনায় কর্মসংস্থান না থাকায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে। অর্থ উপার্জনে ইউরোপ আমেরিকায় যাওয়ার ইচ্ছা থেকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকচক্র এই সুযোগ নিচ্ছে। করোনাকালে মানব পাচারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য আমরা জঙ্গি নির্মূলে যেভাবে কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ করেছি, মানব পাচার প্রতিরোধেও সেভাবে কাজ করা উচিত। তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংস্থাসহ সবাইকে সম্পৃক্ত করে মানব পাচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক হিউম্যান ট্রাফিকিং ল’ আমাদের এখানে হয়েছে। কিন্তু সেটা এখনো কার্যকর করা যায়নি। প্রচলিত আইনের আইনের কঠোর প্রয়োগও এখানে খুবই জরুরি।’

সিআইডির অর্গানাইসড ক্রাইম উইংয়ের ডিআইজি আবদুল্লাহ হেল বাকী বলেন, ‘লিবিয়ার মাসদারে গুলি করে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় সারা দেশে ২৬টি মামলা হয়। মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সিআইডি ইতিমধ্যে প্রায় ২৫টি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের তদবির আমলে নেওয়া হয়নি। চারটি ট্রাভেল এজেন্সি ও একটি এয়ার লাইন্সের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি। কিন্তু আইনিব্যবস্থা ও প্রাণহানির পরও লিবিয়া হয়ে ইতালি যাত্রা বন্ধ হচ্ছে না। প্রায়শই খবর পাই লিবিয়াতে নৌকা ডুবিতে মারা গেছে, পুলিশের হাতে আটক বা গ্রেফতার হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা করার মতো কিছু পাই না। তিনি বলেন, সম্প্রতি লিবিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ নিয়ে বিশ্বব্যাপী একটি সভা করি। সেখানে ফাইন্ডিংস আসে ‘ইতালি এমন একটি জায়গা যেখানে গেলে ফেরত আসতে হয় না’। কেউ কেউ সেখানে ভিক্ষাবৃত্তি করেও দেড় দুই লাখ টাকা আয় করে। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালি যাচ্ছে। লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশে অনঅ্যারাইভাল ভিসা হওয়ায় এসব দেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে পাচারকারীরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনপ্রয়োগে নানামুখী সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভিকটিম ও দালাল পরস্পরের আত্মীয়। তারা মামলায় উৎসাহী হয় না। সিআইডি অবৈধপথে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদেশ না যাওয়া, প্রতারিত হলে মামলা করার আহ্বানসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক জানিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

উত্তর দিন

দয়া করে এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন