আটলান্টার জর্জিয়া টেকে জাতীয় কবির ওপর সাহিত্য কর্মশালা

0
192

আটলান্টার জর্জিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের ওপর কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৪ মার্চ ‘কাজী নজরুল ইসলামের শিল্পসৃষ্টি: বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিকতা’ শীর্ষক দিনব্যাপী এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
অনলাইন বইপ্রেমীদের সংগঠন ‘বইয়ের হাট’ ও জর্জিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এই কর্মশালায় প্রধান বক্তা ছিলেন মিশিগান অঙ্গরাজ্যের গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আজফার হোসেন।
সকাল ও বিকেলে দুটি দীর্ঘ আলোচনায় অধ্যাপক আজফার হোসেন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আন্তর্জাতিকতা, প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার ঐতিহাসিকতা, আরবি-ফারসি একাধিক ভাষার ব্যুৎপত্তি এবং বাংলা সাহিত্যে তার সূত্র ধরে নজরুলের নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর আলোকপাত করেন।
আজফার বলেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নিপীড়িত-শোষিত মানুষের প্রতি গভীর একাত্মতা ঘোষিত হয়েছে। এটি উত্তরকালে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও অত্যাচারীর শাসনের বিরুদ্ধে দানা বাঁধা আন্দোলনের মর্মবাণীকে অসামান্য কুশলতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করেছে। কিন্তু যথাসময়ে, এমনকি আজও নজরুলের সৃষ্টি ভালোভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়নি।
ফলে নজরুলের কবিতার গভীর আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা থাকা সত্ত্বেও তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। অথচ যথাযথভাবে আন্তর্জাতিক প্রচার পেলে এই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা থাকতে পারত চে গুয়েভারার বুকপকেটে, জেলখানায় ভিয়েতনামের নেতা হো চি মিনে বালিশের পাশে বা কেনিয়ার মাউ মাউ আন্দোলনের নেতা ডেডান কিমাথের কণ্ঠস্বরে।
অধ্যাপক আজফার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষক জীবন শুরু করেন। পরে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে আমেরিকায় এসে সম্পন্ন করেন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা। ইংরেজি সাহিত্যে ডক্টরেট অর্জনের পর আমেরিকাতেই শুরু করেন অধ্যাপনা।
বর্তমানে মিশিগান লিবারেল স্টাডিজ ও ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজে অধ্যাপনা করছেন তিনি। দেশে থাকতে
লেখকদের সাংগঠনিক আন্দোলনে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ লেখক শিবিরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।
প্রচণ্ড দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন বলেই প্রান্তিক মানুষের কষ্ট ও ক্ষোভটা বোঝেন আজফার। আর এ কারণেই নজরুলের সত্তার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করেন তিনি সহজেই। কারণ বাংলা সাহিত্যে শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিকদের মধ্যে একমাত্র নজরুলই বৃহত্তর প্রান্তিক সমাজ থেকে উঠে এসেছেন।
মার্ক্সবাদী চিন্তায় বিশ্বাসী আজফার বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যে গত শতাব্দীর ৩০-এর দশকে যে রবীন্দ্র-বিরোধী আধুনিকতার উন্মেষ, সেটা হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের ছত্রচ্ছায়ায়। এই ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা-ভাবনাও দাসসুলভ মনোবৃত্তি থেকে মুক্ত হতে পারে না। একে নজরুল অভিহিত করেছিলেন ‘গোলামি মন’ বলে। যেই পরিস্থিতি এই মানসিক পরাধীনতার জন্ম দেয়, তাকে ক্যারিবীয় বিপ্লবী তাত্ত্বিক ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করেছিলেন।’
দেশে দেশে সাহিত্যের লেনদেনে আজফারের আপত্তি নেই। তবে তাঁর মতে, উপনিবেশবাদী ক্ষমতা-সম্পর্ক প্রসূত জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসের ফলে যখন জাতীয় সংস্কৃতি বিপন্ন হয়, তখন প্রয়োজন হয় পাল্টা জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াইয়ের। আজ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নানা দেশের সংগ্রামী সাহিত্যিকেরা যে জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াইয়ের বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন, তার বহু বহু বছর আগে নজরুল নিজে পাল্টা জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াইয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন।
দীর্ঘ আলোচনার শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে চলে প্রশ্নোত্তর পর্ব। নতুন প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে অনেকেই নজরুলের সাহিত্যের ভালো অনুবাদের খোঁজ করলেন। আজফার হোসেনও অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
কর্মশালায় দশজন অংশ নেয়। কর্মশালাকে অর্থবহ করতেই দিনব্যাপী এই আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল সীমিত।
সবশেষে কর্মশালাকে সফল করায় অংশগ্রহণকারীদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান আয়োজকেরা। তাঁরা বলেন,
বাংলা ভাষায় বিদ্যার্জনকে অবারিত করাই বইয়ের হাট’র উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যে কর্মশালার ভিডিও, পাঠ্য প্রবন্ধ ইত্যাদি সব অনলাইনে তুলে দেওয়া হবে বলেও তাঁরা জানান।

উত্তর দিন

দয়া করে এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন