তারায় তারায় ঝলমলে উৎসব

0
598

ফুল ছড়ায় মধুর সৌরভ, আর তারকা ছড়ায় আলো। কাল শুক্রবার ছুটির দিনের সন্ধ্যায় বিনোদন জগতের তারকাদের আলোতে ঝলমলে হয়ে উঠেছিল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেম। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তারকারা তাঁদের রূপলাবণ্যের পাশাপাশি সৃজনী প্রতিভার মাধুরীতেও মুগ্ধ করে রেখেছিলেন দর্শকদের।

এবার ২০ তম আসর হলো মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের। দীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় এই অনুষ্ঠান দেশের বিনোদন ক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় আর জমকালো অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে সবচেয়ে অধিকসংখ্যক তারকার সমাবেশ ঘটে এই অনুষ্ঠানে। তাঁরা লালগালিচা দিয়ে প্রবেশকালে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলেন, সারা বছর এই অনুষ্ঠানের জন্য প্রতীক্ষায় থাকেন। পুরস্কারের নিরপেক্ষতা, আয়োজনে সুরুচির সঙ্গে অভিনবত্বের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা-এসব মিলিয়ে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তবে এই অনুষ্ঠান নিছক অনুষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়-যখন তারকা ও তাঁদের অনুরাগীদের এই মিলনমেলা বিপন্ন মানবতার পাশে এসে দাঁড়ায়। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। স্মরণে থাকবে, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর এই অনুষ্ঠান থেকে সেই দুর্গত মানুষের জন্য তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তারকারা বিপুল সহায়তা দিয়েছিলেন সেই তহবিলে। এভাবেই ২০ বছরে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার বিতরণীর এই তারকাখচিত অনুষ্ঠান মানবিক মূল্যবোধে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

গতকাল অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের খুদে শিক্ষার্থীদের সেতার বাদনে। কিরওয়ানী রাগ বাজিয়ে শোনায় প্রসেনজিৎ মণ্ডল, টি এম সেলিম রেজা, রিংকু চন্দ্র রায়, মেহেরিন আলম, জয়তী চ্যাটার্জি, মোহাম্মদ কায়সার, জাহাঙ্গীর আলম ও সোহানী মজুমদার। তাদের সঙ্গে তবলা সংগত করেছে প্রশান্ত ভৌমিক, সুপান্থ মজুমদার এবং পারকাশনে ছিল এস জে জে ভুবন।

দর্শকদের তুমুল করতালির ভেতর দিয়ে খুদেরা মঞ্চ ছাড়লে সঞ্চালক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকের আহ্বানে স্বাগত জানাতে আসেন স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের হেড অব অপারেশনস জেসমিন জামান। তিনি বলেন, ‘২০ বছর আগে শিল্পীদের সম্মান জানাতে এই আয়োজন শুরু করা হয়েছিল। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের শিল্পীরা বিশ্ব অঙ্গনে স্থান করে নেবেন। স্কয়ার ভবিষ্যতেও শিল্পীদের পাশে থাকবে।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন মেরিল-প্রথম আলোর মঞ্চ আলোকিত করা সেই প্রিয়মুখগুলোকে, যাঁরা পেয়েছিলেন আজীবন সম্মাননা। আজ তাঁরা আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁরা হলেন সোহরাব হোসেন, সুভাষ দত্ত, আবদুল লতিফ, শাহ আবদুল করিম, কলিম শরাফী, বেবী ইসলাম, সুধীন দাশ, রামকানাই দাশ, ফিরোজা বেগম ও নায়করাজ রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘২০ বছর ধরে এই অনুষ্ঠান হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে আসুন, সবাই মিলে একটি নতুন সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তুলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বাংলাদেশকে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। আমরা চাই সবক্ষেত্রে বাংলাদেশের জয়।’

এরপর আজীবন সম্মাননা দেওয়ার পালা। এবার আজীবন সম্মাননা পেলেন জননন্দিত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম। সঞ্চালক পুরস্কার বিতরণী পর্বের ঘোষণা দিয়ে মঞ্চ ছাড়লেন।

এবার বাজনার তালে তালে নৃত্যমঞ্চে এলেন জনপ্রিয় নায়ক ফেরদৌস। তাঁর সঙ্গে অভিনেত্রী পূজা। মেরিল-প্রথম আলোর জমকালো ২০ তম অনুষ্ঠান উপভোগের আমন্ত্রণ জানালেন ফেরদৌস।

এমন সময় বেজে উঠল তাঁর সেলফোন। কেউ একজন ওপাশ থেকে তাঁর কাছে পূর্ণিমার নম্বর চাইলেন। পূজার সঙ্গে সরস কথোপকথনের একপর্যায়ে মঞ্চে এলেন পূর্ণিমা। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অনুষ্ঠানের ২০ বছরের মতো ফেরদৌস-পূর্ণিমারও অভিনয়জীবনের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এবার। তাই বিশে বিশে মিলিয়ে ‘নাগিনী সাপিনী আয় তোরা আয়’ গানের সুরে সবাই মিলে একঝলক নাগিন নৃত্যও পরিবেশন করলেন মঞ্চে। এর ফাঁকে পর্দায় একঝলকে দেখে নেওয়া গেল বিনোদন জগতের সবচেয়ে বড় এই আয়োজনের ফেলে আসা দিনগুলোর ছবি।

এরপর শুরু হলো সেই বহুল প্রতীক্ষিত পুরস্কার বিতরণের পালা। চলচ্চিত্র, টিভি ও সংগীতের বিভিন্ন বিভাগে মোট ১৫টি পুরস্কার দেওয়া হয় এ বছর। পুরস্কার বিতরণের ফাঁকে ফাঁকে ছিল জনপ্রিয় গানগুলোর সঙ্গে মনমাতানো নৃত্য, ফেরদৌস-পূর্ণিমার সরস কথাবার্তা আর খুনসুটি। ‘আমার মন বলে তুমি আসবে’ গানের সঙ্গে ববিতাকে উৎসর্গ করা নাচে অংশ নেন পপি, ইমন, নীরব ও রোশান।

অন্যদের নকল করার পারঙ্গমতার কিছুটা নমুনা গতবারের অনুষ্ঠানে দেখিয়েছিলেন পূর্ণিমা। এবার তিনি ববিতাকে অনুকরণ করে দেখালেন। হাসির লহরি বয়ে গেল দর্শকসারিতে। এরপরে ছিল চাঁদ নিয়ে গানের সঙ্গে সিয়াম-তানজিন তিশা, তাসকিন রহমান-সাবিলা নূর, অপূর্ব-মেহজাবীন-এই তিন জুটির নাচ। শুধু নাচ হবে গান হবে না, তা কী করে হয়, একসঙ্গে ১০ শিল্পী এলেন মঞ্চে-প্রীতম, মিনার, শেহতাজ, জেফার, ঐশী, দোলা, ইমরান, কিশোর, কনা ও বালাম। গাইলেন তাঁরা যানজট নিয়ে গান।

পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাতে পর্যায়ক্রমে ক্রেস্ট তুলে দেন রামেন্দু মজুমদার, দিলারা জামান, লায়লা হাসান, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, সাকিব আল হাসান ও তাঁর স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশির, ড. ইনামুল হক, লাকি ইনাম, ফারুক, শর্মিলী আহমেদ, আমজাদ হোসেন, সুচন্দা, ইলিয়াস কাঞ্চন, চম্পা, আলমগীর, রোজিনা, বাপ্পারাজ, সম্রাট, সারা যাকের, মামুনুর রশীদ, ফজলুর রহমান বাবু, অপি করিম, এন্ড্রু কিশোর, অদিতি মহসিন, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী, শাবনূর, পপি, ওমর সানী ও মৌসুমী।

ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে কাছে পেলে কে না তাঁর সঙ্গে এক ফ্রেমে বন্দী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবে! স্ত্রী শিশিরকে নিয়ে যখন তিনি মঞ্চে এলেন, তখন পূর্ণিমাও আবদার করলেন তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে। এই নিয়ে বেশ খানিকটা রসিকতাও হলো। আরিফিন শুভ ও মাহি পরিবেশন করলেন নৃত্য। শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নৃত্যনন্দনের শিল্পীরা ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে যখন মঞ্চ ছাড়লেন, তখন রাত বেড়েছে। মনে আনন্দ আর কানে গানের রেশ নিয়ে ঘরের পথ ধরেন সমাগতরা।

উত্তর দিন

দয়া করে এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন