মিয়ানমারে ১০ বছরের ‘গণতন্ত্রের’ অবসান গার্ডিয়ানের নিবন্ধন

0
124

ডেক্স রিপোর্ট :: ২০১০ সালের নভেম্বরে এমনই এক শীতের সন্ধ্যায় মিয়ানমারে শুরু হয়েছিল এক ইতিহাসের। যে দেয়াল সাধারণ মানুষ থেকে সু চিকে আলাদা করে রেখেছিল, সেই দেয়াল তুলে তাকে ‘মুক্তি’ দেয় সেনাবাহিনী।

অং সান সু চির গৃহবন্দী থেকে মুক্তির বিষয়টিকে বিভিন্ন দেশ আনন্দের সঙ্গে নিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল। রাষ্ট্রপ্রধানরা সুচির মুক্তিকে তার দেশে নতুন গণতান্ত্রিক যুগের উদয় হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন।

মিয়ানমারের জাতির জনক জেনারেল অং সানের কন্যা সু চি গণতন্ত্রের জন্য জান্তা শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। এজন্য তাকে প্রায় ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকতে হয়। তাকে আটকে রাখার পুরো সময়জুড়ে অং সান সু চি ছিলেন দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওই সময়ে তিনি নোবেল, সখারভ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাধীনতার পদকসহ বহু পুরষ্কারে ভূষিত হন। নিপীড়নের মুখে মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে প্রতিনিধিত্বকারী নেত্রী হয়ে ওঠেন। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পান।

২০১৫ সালের নির্বাচনে তার দল জাতীয় লীগ ফর ডেমোক্রেসি দুর্দান্তভাবে জয় লাভ করেছিল। প্রেসিডেন্ট হতে না পারায় (প্রয়াত স্বামী মাইকেল আরিসসহ তার সন্তানরা বিদেশি নাগরিক হওয়ায়), এর পরিবর্তে তিনি রাষ্ট্রীয় পরামর্শদাতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।

তবে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তার যেসব চুক্তি করা দরকার ছিল তা পারেননি। দেশের নতুন সংবিধানে সংসদীয় আসনগুলোর ২৫ শতাংশের পাশাপাশি সরকারের মূল মন্ত্রণালয়গুলোও নিয়ন্ত্রণ করছিল সেনাবাহিনী। ফলে সু চি প্রকৃতপক্ষে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।

উদ্বেগের বিষয় ছিল যে, তার সমর্থন একটি ইউনিফর্মধারী বাহিনীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি শাসনের বৈধতা এনে দিয়েছিল, যা গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক ছিল।

২০১৬ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতায় বসে এনএলডি। এরপরই আসে সু চির সবচেয়ে সমালোচিত হওয়ার সময়। তার বাবার প্রতিষ্ঠিত সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার নিন্দা করতে অসমর্থতা বা অক্ষমতা সু চির ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করে। কারণ ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর ধর্ষণ ও গণহত্যা চালিয়েছিল এবং গ্রামগুলো আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এর জেরে লাখ লাখ রোহিঙ্গার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তখন সবচেয়ে প্রান্তিক, সবচেয়ে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এ সহিংস অভিযান থেকে রক্ষায় অং সান সু চি’র প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের রক্ষার পরিবর্তে, বিভেদে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

এ সংক্রান্ত মামলার বিচার চলাকালে হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে তিনি বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি জটিল এবং চেনা সহজ নয়।’ সু চি গণহত্যার অভিযোগ একটি ‘পরিস্থিতির অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর বাস্তব চিত্র’ ছিল বলেও উল্লেখ করেন। কেবল রোহিঙ্গা নয়, মিয়ানমারের জাতিগত সংখ্যালঘুদের দুর্দশা দেখার ক্ষেত্রে বরাবরই তার অন্ধত্ব কাজ করেছে।

এমন আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া গণতন্ত্রপন্থী এ নেত্রীর গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তির মধ্যদিয়ে মিয়ানমারে যে ‘স্বাধীন যুগ’ শুরু হয়েছিল তা আবার শেষ হলো তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে।

এ নিয়ে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান ‘টেন ইয়ার্স অব ফ্রিডম এন্ডস: মিয়ানমারস টার্নিশড হিরোইন সিজ ডার্ক ডেজ রিটার্নস’ শিরোনামে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।

সোমবার মিয়ানমার সেনাবাহিনী ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেত্রী অং সান সু চি, দেশটির প্রেসিডেন্ট ও দলটির অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটক করে। একই সঙ্গে দেশটিতে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

সর্বশেষ গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে ঘিরে মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার ও প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর মধ্যে কয়েকদিন ধরে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা চলছিল। নভেম্বরের নির্বাচনে সু চির দল ২০১৫ সালের চেয়ে আরও ভালো জয় পায়। কিন্তু নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে সামরিক বাহিনী ফল মানতে অস্বীকৃতি জানায়।

এরই এক পর্যায়ে সোমবার সেনাবাহিনী দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সামরিক বাহিনী পরিচালিত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভিডিও ভাষণে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিং অং লাইংয়ের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে।

মিয়ানমারের স্বতন্ত্র বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন মনে করছেন, জাতীয় আইকন হিসেবে অং সান সু চির মর্যাদাকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর পদক্ষেপগুলোর পাল্টা জবাব আসতে পারে।

তিনি বলেন, ‘একটি প্রজন্ম রয়েছে যারা তার সঙ্গে গৃহবন্দি হয়ে বড় হয়েছেন এবং একটি তরুণ প্রজন্ম তার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠেছে ও সত্যিই তাকে সমর্থন করছে। বিভিন্ন জাতিগত রাজ্যে প্রচুর লোক রয়েছে যারা তাকে বা তার দলকে সমর্থন করে না- তবে সেনাবাহিনীকে ঘৃণা করে।’

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বজুড়ে অং সান সু চির অপূরণীয় কলঙ্কিত কুখ্যাতি সত্ত্বেও এ সামরিক অভ্যুত্থান সর্বজনীন ও কৌতুকপূর্ণ নিন্দার জন্ম দিয়েছে। দেশটিতে দেখা দিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।

লেখক ইতিহাসবিদ থান্ট মাইয়ান্ট-ইউ লিখেছেন, ‘সবেমাত্র একটি ভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য দরজা উন্মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন আমার ডুবে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে যে, এরপরে যা ঘটবে তা কেউ সত্যিই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না।’

উত্তর দিন

দয়া করে এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন