সুনামগঞ্জের আব্দুর রহমান ৫০বছর পর দুই পায়ে দাঁড়ালেন

0
62

নিজস্ব প্রতিবেদক:: একাত্তরে আমাদের যখন যুদ্ধদিন, আব্দুর রহমান তখন নিতান্তই বালক। বয়স ১০ কি ১২ হবে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়াঘাটে বাড়ি তার। ১০/১২ বছরের শিশু যুদ্ধের আর কি বুঝে! অন্য বালকদের সাথে খেলা করেই তখন সময় কাটতো তার।

আব্দুর রহমানদের বাড়ির পাশেই ক্যাম্প গড়েছিলো পাকিস্তানি বাহিনী। এর অদূরে নারায়ণ তলা নামক স্থানে ছিলো মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। পরষ্পরকে নিশ্চিন্ন করতে এই এলাকায় পথে পথে মাইন পুঁতে রেখেছিলা দুই বাহিনী।

একাত্তরের কোনো একদিন, আব্দুর রহমান দিন তারিখ ঠিক মনে করতে পারেন না, বন্ধুদের সাথে খেলা করছিলেন তিনি। হঠাৎ একটি মাইনে পা পড়লে তা বিস্ফোরিত হয়ে যায়। মাইন উড়িয়ে নেয় আব্দুর রহমানের বাম পা।

এরপর আর কিছু মনে নেই আব্দুর রহমানের। জ্ঞান ফেরার পর থেকেই তার সঙ্গী বাঁশের লাঠি। ডান পায়ের হাঁটু পর্যন্ত আছে। বাকীটুকুর অস্থিত্ব নেই।

এরপর থেকে লাঠিতে ভর দিয়েই চলে তার জীবন। একাত্তরের এই চিহ্ন বয়ে বেড়াতে হয় তাকে। স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে সংসার আব্দুর রহমানের। বর্গাচাষ করে সংসারই চলে না। তার আর সাধ্য কোথায় নতুন পা সংযোজনের! ফলে একপায়ের জীবনই হয়ে ওঠে তার ভবিতব্য।

মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এখন অনেক আয়োজন, অনেক হাঁকডাক। এই সময়েও আব্দুর রহমানের খোঁজ নেন না কেউ। তার আর দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো হয় না।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক হাসান মোরশেদ তাদের জেনোসাইড আর্কাইভের কাজে বছর তিনেক আগে গিয়েছিলেন সুনামগঞ্জে। সেখানেই তার দেখা হয় আব্দুর রহমানের সাথে। আব্দুর রহমানের পা হারানোর গল্প শুনেনন তিনি।

এরপর আব্দুর রহমানের কৃত্রিম পা লাগানোর উদ্যোগ নেন হাসান মোরশেদ।

পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি)’র সহযোগিতায় অবশেষে পঞ্চাশ বছর পর লাঠি ছাড়াই হাঁটলেন আব্দুর রহমান। সাভারে সিআরপিতে আব্দুর রহমানের কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন তিনি। দুপায়ে হেঁটেই সিআরপি থেকে ঢাকার এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন তিনি।

পঞ্চাশ বছর পর পা ফিরে দারুণ খুশি আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে পা নয়, নতুন একটা জীবন ফিরে পেয়েছি। এতদিন লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে খুব কষ্ট হতো। ভালো করে কাজ করতে পারতাম না। মানুষজন তাচ্ছিল্য করতো।

আব্দুর রহমান বলেন, কৃত্রিম পা লাগানোতে এখন লাঠির সাহায্য ছাড়াই হাঁটাচলা করতে পারছি। তবে প্রথম প্রথম কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে। যদিও সিআরপির চিকিৎসকরা বলেছেন, কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।

আব্দুর রহমানের পা সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া মুক্তিযুদ্ধ গবেষক হাসান মোরশেদ বলেন, জেনোসাইড আর্কাইভের কাজ করতে সুনামগঞ্জ গিয়ে আমি আব্দুর রহমানের দেখা পাই। তখনই তাকে সাধ্যমত সহায়তার আশ্বাস দেই। এরপর সিআরপি’র ট্রেজারার সায়েদুল খালেদ কৃত্রিম পা সংযোজনে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, গতমাসে সিআরপির সিলেট কার্যালয়ে আব্দুর রহমানকে এনে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করানো হয। এরপর গত সপ্তাহে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সাভারে প্রধান কার্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পা সংযোজনের পর বৃহস্পতিবার তিনি ছাড়া পেয়েছেন।

হাসান মোরশেদ বলেন, পা সংযোজনে সিআরপিরই বেশিরভাগ খরচ বহন করেছে। এছাড়া ওয়াশিকুজ্জামান ওনি নামে আমাদের আরেক বন্ধু সহায়তা করেছেন।

উত্তর দিন

দয়া করে এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন